আর্টিকেল: গামছা রচনা

 গামছা রচনা

   - পারভেজ 




পাখা তার মনের আনন্দে শান্তিমতো ধীরে ধীরে পাক খাচ্ছে। আমি খোলা জানালার পাশে বসে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছি শূণ্যে। আজকে আসমানের বর্ণ না নীল, না সাদা, না একেবারে কালো মেঘলা; যেন সে ম্লান হয়ে গেছে অথচ হাসছে, কাঁদতে চায়ছে না অথচ কাঁদছে। এ কান্না যেন থামছেই না! গরমকালে তীব্র তাপে হয়তো সে গামছা দিয়ে গা ঢাকা দিয়েছিল। এখন সে গামছা থেকে ঝরঝর করে পানি পড়ছে। আমার তৃষ্ণা লাগলো, পানি নিতে গিয়ে দেখি কলসে পানি নাই, গামছা মাথায় দিয়ে নলকূপ থেকে পানি আনতে গেলাম। কয়েকদিন ধরে খেয়াল করছি যে, আমি যে কাজই করি না কেন সাথে গামছা থাকছেই। 

হয়তো কোনো একদিন হঠাৎ করে কলাপাতা থেকে সভ্য মানুষের গামছার ব্যবহার শুরু। এখন এ গামছা আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জড়িয়ে গেছে। নিত্যদিনের ব্যবহার্য হলো এই গামছা, তাই হয়তো ভাবা যেতে পারে এটা একটা মামুলি বস্ত্র- তবে আমি মনে করি গামছা আমাদের জীবনে বিজ্ঞানের বিশেষ আশীর্বাদ! আপনি একটা ক্ষেত্র দেখাতে পারবেন না যেখানে গামছার ব্যবহার নাই! আমাদের সমাজে, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে, শিল্পে, সাহিত্যে, চিকিৎসায়, ব্যাবসায় - বাণিজ্যে, উৎসবে, কৃষিকাজে, মাছ ধরায়, খাবার তৈরিতে, পোশাক হিসেবে, সঙ্গীতে, চলচ্চিত্র ও নাটকে, খেলাধুলায়- এমন আরও কত ক্ষেত্রে গামছার দৈনন্দিন ব্যবহার অসামান্য।

গা মোছা থেকে গামছা হয়ে আমাদের অর্থাৎ বাঙালির জীবনাচারের সঙ্গে এর এক অটুট বন্ধন গড়ে উঠে ফলে গামছা বাঙালিয়ানার প্রতীক। গামছা সাধারণত কম জায়গা দখল করে, এর ওজন সামান্য- পাতলা। এজন্য গামছা খুব জনপ্রিয়। গামছা বিভিন্ন রঙের হয়ে থাকে, সেলাই করা কিংবা সেলাইবিহীন। এতে গামছা সবার নজর কাড়ে।

বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িষ্যায় গামছার জনপ্রিয়তা একটু বেশিই। বেশির ভাগ গামছায় চেকের ব্যবহার লক্ষ্যনীয়। সাধারণত গামছা সেলাইবিহীন হলেও, ভারতের ওড়িষ্যায় সেলাই করা গামছা আমাদের নজর কাড়ে। বাংলাদেশে সব শ্রেণির মানুষের কাছে গামছা একটি প্রয়োজনীয় ও জনপ্রিয় বস্ত্র। এ দেশের গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে যুগ যুগ ধরে মিশে আছে এই গামছা। গানবাজনা থেকে শুরু করে গোসল শেষে গা মুছতে, চুল ঝাড়তে কত কিছুতেই না রয়েছে এর ব্যবহার!

সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির জীবনে এখনো এর চাহিদা কমেনি, বরং পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা। ইদানিং বিভিন্ন নামিদামি কোম্পানি তাদের ফ্যাশন জগতে গামছার নানা ব্যবহার করছে। যেমন- গামছা কাপড়ের শার্ট, পাঞ্জাবি, টি শার্ট, কামিজ, ফতুয়া ইত্যাদি। বাঙালিদের প্রত্যেক ঘরে রয়েছে একটি করে গামছা। আমাদের জীবনে গামছা যেমন প্রয়োজনীয় তেমন অত্যাবশ্যকীয়। তবে দৈনন্দিন কাজে আমরা গামছার ব্যবহার করলেও এর গুরুত্ব আমরা খুব কমই উপলব্ধি করতে সক্ষম হই। আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীবনযাত্রার ঘনিষ্ঠ এই গামছা আমাদের গর্ব। বাঙালির পুরোনো ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে গামছা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নানা রূপ দেওয়া হচ্ছে। গামছা তৈরির কাপড়টাকে আরেকটু নরম করে গামছায় ব্যবহৃত রং এবং নকশার ধরন বজায় রেখে বানানো হচ্ছে শাড়ি, পাঞ্জাবি, শার্ট, ফতুয়া, ব্লাউজ, স্কার্ট ও টুপি। এ ছাড়া এখন বানানো হচ্ছে জুতা, ঝুড়ি সেট, ঝোলা ব্যাগ, ল্যাপটপ ব্যাগ, পানির বোতল রাখার ব্যাগ, মোবাইল ব্যাগ, হাতের বালা ইত্যাদি।


একটা সামান্য গামছা নিয়ে আমার মননে এমন গামছা রচনা হবে এটা নিয়ে আমি চিন্তিত। বাস্তবে খেয়াল করে দেখলাম পানি নিতে এসে বৃষ্টির পানিতে আমি ভিজে গেছি। তাড়াতাড়ি করে ঘরে এসে শুকনো গামছা দিয়ে গা মোছা শুরু করলাম। আসলে গামছার জন্ম রহস্যে ঘেরা ও মজাদার।

সভ্য মানুষের কাছে যখন সুতা আসে তখন তারা বুদ্ধি খাটিয়ে কাপড় তৈরি করে। তবে তাদের আবিষ্কার করা গামছা আমাদের আরো সভ্য করে তোলে। গামছার আবিষ্কারক ইতিহাসের পাতায় তার নাম লিখে রেখে যাননি। তবে গামছা আবিষ্কারকের এ অবদান আমরা ভুলবো না।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গামছার প্রচলন থাকলেও এর ব্যাপক প্রচলন রয়েছে ভারতের আসাম রাজ্যে। সেখানে বাড়িতে কোনো অতিথি এলে গলায় গামছা পরিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। আসামে গামছাকে বলা হয় গামোচা। তাদের গামছার জমিন সাদা এবং চারদিকে লাল সুতার বাহার থাকে। ইতিহাসবিদ লীলা গগৈ লিখেছেন, অহোম রাজার আমল (একাদশ শতক) থেকেই আসামে গামোচার প্রচলন শুরু হয়। এ হিস্ট্রি অব আসাম গ্রন্থে এডওয়ার্ড গেইটর বলেন, ১৭৩৯ সালে একটি গামোচার দাম ছিল ৬ (ছয়) পয়সা। সেখানকার বিভিন্ন সামাজিক-ধর্মীয় আচার-অনুষ্টান ও উৎসবে গামছার ব্যবহার দেখা যায়। বিশেষ করে বিহু উৎসবের সঙ্গে গামোচার সম্পর্ক বিদ্যমান। এ উৎসবের দিন যুবকরা মাথায় গামোচা বেঁধে নৃত্যে অংশ নেয়। 

প্রাচীনকাল থেকে বাংলায় দুটো জিনিস এক সঙ্গে ব্যবহার হতো আর তা হলো লুঙ্গি ও গামছা। গামছা নারী ও পুরুষ উভয়ের কাছেই বেশ জনপ্রিয়। গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক সমাজে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় পার্বনে (যেমন- ঈদ, পুজা, মেলা, আম-কাঠালের মৌসুম, পিঠাপুলির সময়) জামাইদের নিমন্ত্রনের প্রচলন ছিল। তারা সপরিবারে শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে এলে মেয়েদের শাড়ি এবং জামাইদের উপহার হিসেবে লুঙ্গি ও গামছা দেয়া হতো।

বাংলার পোশাক-পরিচ্ছদ ছিল ধুতি, লুঙ্গি, চাদর, ফতুয়া, গামছা ইত্যাদি। সাধারণত গামছা পরেই তারা বিবিধ কায়িক শ্রমে নিয়োজিত হতো। এক কথায় বাংলার জীবনের সাথে গামছা যেন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নরম সুতায় হাতে বোনা গামছার কদর বাঙ্গালির কাছে কখনই ফুরোবার নয়। শুধু তাঁতীরাই নয় বাঙ্গালি, মণিপুরি সাঁওতাল, চাকমা, মারমা, গারো ইত্যাদি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর হৃদয় নিংড়ানো কল্পনার রঙ ও মনের মাধুরী দিয়েও হাতে তৈরি হয় এই গামছা। তাই এসব গামছার ভাঁজে ভাঁজে জড়িয়ে থাকে এক একটি জনপদের সহস্র বছরের সঞ্চিত আবেগ, দক্ষতা, স্মৃতি ও ঐতিহ্য। এগুলো কেবলই সুতোর পরে সুতো দিয়ে গাঁথা কোন আটপৌরে শিল্প নয়, বরং পরম মমতা ও ভালবাসার এক একটি স্মারক।

সাধারণত গামছা বোনা হয় তাঁতে। তবে এখন আধুনিক মেশিনে তৈরি হলেও হাতে তৈরি গামছাই বেশি জনপ্রিয়। বাংলাদেশের সেরা গামছা বোনে নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার মিরাট ইউনিয়নের তাঁতিপাড়ার গৃহিণীরা। খুলনার ফুলতলার গামছারও রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। আবার ঝালকাঠির বাসন্ডা গামছারও নাম আছে দেশজুড়ে। এছাড়াও বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার অন্যতম পোশাক শিল্পনগরী সিরাজগঞ্জে ছোট-বড়-মাঝারী কয়েক হাজার তাঁত এবং কুটির শিল্পে বাহারি গামছা তৈরি হয়। ইদানিং কুিষ্টয়ার কুমারখালিতে গামছার মতো এক ধরনের মোটা তোয়ালে দেশব্যাপী ব্যাপক চাহিদা তৈরি করেছে । তোয়ালে রচনা নিয়ে অন্য আরেকদিন আলোচনা করা যাবে।

আসলে গামছা কাপড়ে একটা আরাম আছে। আর এর চমৎকার রং, ঢং ও নকশা দেখে মনে হয় যেন উৎসব লেগে আছে। আর আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন রঙিন গামছা, গোসল বা স্নানের পরে এবং কেউ তাদের পোশাকে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হওয়ার আগে বিনয়ের একটি দুর্দান্ত রক্ষক। আপনার পুরানো জামাকাপড়, বা একেবারে নতুন জামাকাপড়ের সেট, আপনার শরীর এখনও ভেজা অবস্থায় পুনরায় প্রবেশ করা উচিত নয়। একটি ভেজা শরীর শুধুমাত্র অস্বস্তিকর হতে পারে না কিন্তু আবহাওয়া হিমায়িত হলে হাইপোথার্মিয়ার ঝুঁকিও হতে পারে।


আমার জীবনে অনেক কিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে গামছা। গা মোছা থেকে শুরু করে ঘরের শোভা বর্ধনে অল্প খরচে বেশ সুবিধা লাভ করতে পারি। গরমকালে তীব্র গরমে গামছাই স্বস্তি দিয়ে আসছে। গা মোছা শেষ করে গামছাটা দড়িতে শুকাতে দিলাম। গামছার আরেকটা সুবিধা হলো এটা তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়। গামছা রচনা মাথা থেকে যাচ্ছেই না, দেখছি! আসলে আমাদের মতো ব্যাচেলরদের জীবনে গামছার বিশেষ উপকারীতা লক্ষ্যণীয়। গামছার এদিকটা বিবেচনা করে আজ অর্থাৎ ২৫শে সেপ্টেম্বর গামছা দিবস উদযাপন করলে কেমন হয়?!

বাঙালি জীবনে গামছা সকল কাজের কাজী। সংস্কৃতি হলো মানুষের জীবন প্রনালী। বাঙালি সংস্কৃতির সাথে ওতোপ্রোতভাবে মিশে আছে অনেক উপাদান। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো গামছা। পা থেকে মাথা-সব কিছু মুছতে ও ঢাকতে, মাছ থেকে গাছ-সব কিছু ধরতে, মেয়েদের ওড়না, ঘর সাজানোর টুকিটাকিতে, বিয়ের গাড়ি সাজাতে, এমনকি ল্যাপটপ ও কম্পিউটার বয়ে বেড়ানোর ব্যাগেও গামছা। গামছা ভিজালে দ্রুত তা শুকিয়ে যায়। গোসল সেরে বাড়ি ফিরতে ফিরতেই পিঠের উপর গামছা শুকিয়ে যায়। তাই যে কোনো ভ্রমনে গামছার এই সুবিধা আস্বাদন করা যায়।

নারীরা চাইলেই নিজেদের চাহিদা মোতাবেক প্রয়োজনীয় জিনিস নিজেরাই তৈরি করতে পারে। তবে এখন এ ধারণা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। কেউ জীবিকা নির্বাহ করে আবার কেউ বিলাসীতার জন্য কিনে নেয়। তবে আমাদের মতো মধ্যবিত্তরা প্রয়োজনের তাগিদে কিনে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কয়েক হাজার তাঁত শিল্প রয়েছে। এই শিল্পে হাজার হাজার শ্রমিক গামছা বুননের কাজ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। নারী শ্রমিকেরা নিজ হাতে তাঁতের বস্ত্র সামগ্রী ও গামছা উৎপাদন করে। গরু-মহিষের গাড়ি, রিকশা, ভ্যান, ঠেলাগাড়ি, নছিমন চালকদের কাছেও গামছা একটি প্রয়োজনীয় জিনিস।

এখন কৃষিপ্রধান মাছেভাতে বাঙালির জীবনে গামছাকে তার সৌন্দর্য, পূর্ণতা ও সজীবতা ফিরে পায়।

সূর্যোদয় হতে এখনো সময় আছে, এমন সময়ে বাংলার কৃষকের চোখ খুলে; খুব ভোরে কৃষক যখন মাঠে যায় তখন তার এক কাঁধে লাঙল আরেক কাঁধে একটি গামছা থাকে। গামছার একদিকের খুঁটে বাঁধা থাকে চিড়ে-গুড়-মুড়ি। কৃষকের স্ত্রী-সন্তান তার জন্য বাড়ি থেকে ভাত নিয়ে আসে মাটির সানকিতে গামছা বেঁধে। কৃষক কাজে বিরতি দেয়া, হাত-মুখে পানি দেয়, গামছায় মুখ মুছে ও সেই গামছা বিছিয়ে খেতে বসে। খাওয়া শেষে কাছের কোনো গাছের ছায়ায় গামছা বিছিয়ে একটু জিরিয়ে নেয়। এছাড়া ধানকাটা, পাটকাটা, মাটিকাটা ইত্যাদি কাজের সময় কোমরে গামছা বেঁধে নেয়। বাংলার দিনমজুররাও মাথায় গামছা বেধে ভারী জিনিসপত্র বহন করে থাকেন। আবার কাজ শেষে বিশ্রামের সময় শ্রমিকের গামছা দিয়েই একটু হাওয়া করে গা জুড়িয়ে নেয়। আবার রাখাল বালকদের ঘাড়েও গামছা দেখতে পাওয়া যায়। ভারী কোনো মালামাল তুলতে বা টানতে শ্রমিকদের কোমরে বাঁধা থাকে গামছা। মাঝি দাঁড় বায়, গুণ টানে কোমরে গামছা বেঁধে। শরীরের শক্তিকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর জন্যই কোমরে এই গামছা বাঁধা। কোমরে গামছা বেঁধে লাগা। এর অর্থ হলো শরীরের শক্তিকে পুরোপুরি কাজে লাগানো।

বাংলার মানুষেরা কোমরে গামছা বেধে পলো নিয়ে মাছ ধরতে নামে। আবার নদীর তীরের ছেলেমেয়েরা গামছা দিয়ে পোনা মাছ ধরে। বর্ষা শেষে যখন খাল-বিলের পানি শুকিয়ে যায়, তখন ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা হাঁটুজলে গামছা পেতে মাছ ধরে। মাছ ধরা শেষে গামছায় মাছ বেঁধে বাড়ি ফেরে। অন্যদিকে জেলেরা রোদ-বৃষ্টি থেকে রেহাই পেতে গামছা ব্যবহার করে থাকে।

বাংলার গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা কানামাছি বা রুমালচোর খেলতে গিয়ে চোখ বাঁধার জন্য গামছাকে কাজে লাগায়। রুমালচোর খেলতে গেলে রুমালের দরকার, হাতের কাছে গামছা সহজে পাওয়া যায় বলে সে প্রয়োজনও মিটে গামছা দিয়ে। হাড়িভাঙ্গা খেলায়ও গামছা দিয়ে চোখ বাঁধা হয়।

বাঙালির ভাষা ও সাহিত্যে গামছা তার ঠিক জায়গা করে নিয়েছে। যেমন: কয়েকটি বাগধারা হলও- গলায় গামছা দেওয়া; এর অর্থ কাউকে লাঞ্ছিত করা, অপমান ও জবরদস্তি করে কোনো কিছুতে বাধ্য করা। গামছা ডলা; এর অর্থ হলো গামছা দিয়ে মর্দন, গোসলের সময় গামছা দিয়ে গা পরিষ্কার করা। গামছা বাঁধা; এর অর্থ হলো গামছা দিয়ে বাঁধা। কবিতার গামছা যেমন: পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের আমার বাড়ি কবিতায় গামছা-বাঁধা দইয়ের কথা উল্লেখ আছে।

"আমার বাড়ি যাইও ভোমর,  

 বসতে দেব পিঁড়ে,  

 জলপান যে করতে দেব  

 শালি ধানের চিঁড়ে।  

 শালি ধানের চিঁড়ে দেব,  

 বিন্নি ধানের খই,  

 বাড়ির গাছের কবরী কলা,  

 গামছা-বাঁধা দই।"

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমাদের ছোট নদী কবিতায় গামছার উল্লেখ আছে।

"তীরে তীরে ছেলেমেয়ে নাহিবার কালে

গামছায় জল ভরি গায়ে তারা ঢালে।

সকালে বিকালে কভু নাওয়া হলে পরে

আঁচলে ছাঁকিয়া তারা ছোট মাছ ধরে।"

বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে গামছা তার উপস্থিতি দেয় বাংলার লোকসঙ্গীতে। গামছা মাথায় বা গলায় ঝুলিয়ে শিল্পীরা গান গেয়ে থাকেন যেমন: গামছা পলাশ। গায়ক আব্বাসউদ্দীন গেয়েছেন,

"যদি বন্ধু যাবার চাও

ঘাড়ের গামছা থুইয়া যাও রে.."

সাহিত্য ও সঙ্গীতে গামছা তার ঘর বানিয়ে চলচ্চিত্র ও নাটকেও বাস করেছে। ভারত ও বাংলাদেশের অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের গলায়/কাঁধে গামছা চোখে পড়ে। ভারতীয় পরিচালক অনুরাগ "কাশ্যপ তাঁর গ্যাংগস অব ওয়াসিপুর" -এর নায়ক-নায়িকাদের গলায় গামছা বাঁধিয়ে কান চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। হিন্দি "তাশান" ছবিতে অক্ষয় কুমার গামছা মাথায় অভিনয় করেছেন । তবে গামছা নায়ক যদি বলিউডের কাউকে বলতে হয় তবে তিনি হলেন গোবিন্দ। গলায়, মাথায়, হাতে, কোমরে-কোথায় গামছা বাঁধেননি তিনি! বাংলাদেশের বিখ্যাত "গায়ের ছেলে" ছবিতে নায়ক ফারুক মাথায় ও কোমরে গামছা বেঁধে অভিনয় করেছেন। আবার "বাবা কেন চাকর?" ছবিতে নায়করাজ রাজ্জাক ঘাড়ে গামছা পড়ে ঠেলাগাড়ি চালিয়েছেন।


আচ্ছা, এত তথ্য আসছে কোথা থেকে? এত কিছু কি পড়তে হবে? মনে রাখতে হবে? না-তো। আচ্ছা, গামছা রচনা আর কতদূর রচনা হবে? এত রচনা থাকতে গামছা রচনা কেন? বাঙালি বলে কথা! আমার ক্ষুধা লেগে গেছে। আজকে পোলাও আর মাংস রান্না হয়েছে। পোলাও গামছা দিয়ে ঢাকা আছে। আমার ক্ষতরনাক ক্ষুধা লেগেছে, আমি এক থালা ভর্তি পোলাও আর এক বাটি মাংস নিয়ে খেতে শুরু করলাম।

বাঙালি সমাজে কোনো বড় ধরনের উৎসব-আয়োজনে বাবুর্চিরা সাধারণত নতুন গামছা পরে রান্না করেন; এটি একটি প্রচলিত রীতি। বিশেষ করে পোলাও রান্নার কাজে গামছার ব্যবহার চোখে পড়ে। আবার নানা ধরনের মিষ্টি তৈরির জন্য দুধ থেকে ছানা তুলতে হয়। ছানার মধ্যে যে তরল অংশ থাকে তা ছাড়ানোর কাজে ছানা গামছায় বেঁধে পানি ঝরাতে হয়। দরিদ্র পরিবারে টিফিন বক্সের বিকল্প হিসেবে গামছার ব্যবহার লক্ষ্যনীয়। বৈশাখ মাসে আমের মৌসমে ছুরি বা চাকু না থাকলেও সমস্যা নেই। আম গামছায় মুড়ে গাছের গোড়ায় আছড়ালেই আম ফেটে আঁটি বেরিয়ে আসবে। আবার তালের রসের মধ্যে যে তেতো অংশ থাকে তা ছাড়াতে গামছায় বেঁধে রস ঝরানো হয়।

(অবাক হবেন না!) চিকিৎসাতেও গামছার ব্যবহার রয়েছে। কোথাও কেটে গেছে, হাতের কাছে ব্যান্ডেজ নেই, গামছা একটি তাৎক্ষণিক সমাধান। কেউ জ্বরে আক্রান্ত হলে গামছা ভিজিয়ে গা মোছা হয়। গ্রামের দিকে এখনো সাপে কাটা রোগীর হাতে বা পায়ে গামছা দিয়ে শক্ত করে বাধা হয়। আবার সাপে কাটলে রোগীর বিষ নামানোর সময় সাপুড়েরা (ওঝা) মাথায় ও কোমরে গামছা বেঁধে বিন বাজাতো ( বিন বাজিয়ে বিষ নামে না; রোগীকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে )।

গামছা বাংলার ধর্মীয় উৎসব ও সংস্কৃতির সাথে মিশে আছে। যেমন: ইসলাম ধর্মে- নামাজ পড়তে গেলে অজু করার পর হাত মুখ মুছতে গামছার প্রয়োজন হয়, অনেকে গামছা বিছিয়ে নামাজ আদায় করে থাকেন, গ্রামের মসজিদে, বিশেষ করে শুক্রবারে তবারক বিতরণ করা হয় গামছায় রেখে, আবার মুসলিম বিবাহরীতিতে গামছার ব্যবহার হয়। সনাতন ধর্মে- বিবাহ রীতি, পূজা-পার্বন, অপনয়ন (পৈতা নেওয়া), দীক্ষা গ্রহণ, চন্দ্রায়ন, শ্রাদ্ধানুষ্ঠান ইত্যাদি কর্মকান্ডে পুরোহিতকে দক্ষিণা হিসেবে শাড়ী, ধূতি, নগদ অর্থ ও অন্যান্য সামগ্রীর পাশাপাশি গামছা দেওয়া বাধ্যতামুলক। তাছাড়া ঈদ ও পুজার সময় নতুন গামছার ব্যবহার চোখে পড়ে। 

এছাড়াও বাঙালির বিভিন্ন উৎসব ও আয়োজনে গামছার ব্যপক ব্যবহার হয়ে থাকে। বিশেষ করে পহেলা বৈশাখে তরুণ-তরুণীরা হাতে, মাথায় গামছা বেঁধে থাকে। অনেকে গামছা মাথায় পরে নৃত্য পরিবেশন করে। এছাড়া পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে যে মেলা বসে, সে মেলার স্টল সাজানোর অন্যতম আইটেম হলো গামছা। গামছা জিনস, টি-শার্টের সঙ্গে, ধুতি সালোয়ার ও টপের সঙ্গে মাথায় বেঁধে বা গলায় ঝুলিয়ে রেখেও পরতে দেখা যায় বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে।

এক সময় গামছাকে পোশাক পরিচ্ছদের অংশ হিসেবে মনে করা হতো। গ্রামের লোকজন লুঙ্গির বিকল্প হিসেবে গামছা পরিধান করত। এক সময় এখনো কেউ কেউ কখনো-সখনো গামছা পরে থাকে। ইদানিং গামছা বা গামছার নকশার কাপড়ে তৈরি ছেলেদেরকে শার্ট, পাঞ্জাবি ও ফতুয়া এবং মেয়েদেরকে ওড়না, শাড়ি, ব্লাইজ, সালোয়ার-কামিজ পরতে দেখা যায়। আর শীতকালে কনকনে বাতাস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে মাফলার হিসেবে গামছা দিয়ে মাথা-কান ঢেকে রাখে।

শুধু পোশাকেই নয়; ফ্যাশন দুনিয়ায় সর্ব স্তরেই রয়েছে গামছার বহুল ব্যবহার। গামছা দেশীয় ঐতিহ্য আর সমকালীন ট্রেন্ডের যথাযথ সমন্বয়। এ দেশের ছোট সোনামণিদের বউ সাজার শখ হলে গামছা পরেই লাল টুকটুকে বউ সেজে তাদের ইচ্ছে পূরণ করে। ফ্যাশন হাউস গুলোতে মেলে গামছা কাপড় দিয়ে তৈরি টিস্যু বক্স, ল্যাপশেড, টেবিল রানার, জুয়েলারি বক্স, কুশন কভার, শতরঞ্জি, পেইন্টিং ফ্রেম, নোটবুক ইত্যাদি। ফ্যাশনেবল ব্যাগ তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে গামছা। রাবারের সোল, লেদার আর গামছা গিয়ে তৈরি হচ্ছে ছেলেমেয়েদের স্যান্ডেল। রয়েছে ল্যাপটপ ব্যাগও। এ ছাড়া রয়েছে রুমাল, মাথার ব্যান্ড ও ফিতা। আড়ং, বিবিয়ানা, যাত্রা, সোর্স, দেশিদশ, স্বদেশীসহ প্রায় সব দেশীয় ফ্যাশান হাউজ কাজ করছে গামছা নিয়ে। 

গ্রাম বাংলায় গামছার জনপ্রিয়তার কারণে বঙ্গবীর খ্যাত কাদের সিদ্দিকী এটাকে প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছেন এবং তিনি উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছেন। তিনি ব্যক্তি জীবনেও সব সময় গামছা ব্যবহার করেন। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন আইকন ও ডিজাইনার বিবি রাসেলের ফ্যাশনে ও শহুরে বাঙ্গালিয়ানার উৎসব অনুষ্ঠানে গামছার বহুল ব্যবহার দেখা যায়। দেশে গামছা ফ্যাশনের সূচনায় বিবি রাসেল ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছেন। তিনিই মূলত বাংলার এ ঐতিহ্যকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরেন। এরপর থেকে ফ্যাশনের একটি আলাদা অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় গামছা। বর্তমানে গামছা নিয়ে বিশ্বের ফ্যাশন জগৎ মাতিয়ে চলছেন এ দেশের তরুন ডিজাইনাররা।


খাওয়া শেষ আমার। হাত ধুয়ে গামছায় হাত মুছলাম। আজকে আবার আমার বিছানার চাদর ধুয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক ঘুম পাচ্ছে। কি আর করার - গামছা বিছিয়ে শুয়ে পড়ি! গামছা রচনা আর রচনা করব না; এখন এ বরষার দিনে লম্বা একটা ঘুম দিব। আচ্ছা, গামছা নিয়ে কোনো সংস্কার/কুসংস্কার নাই?

যদি বিছানার চাদর না থাকে, গামছা বিছিয়ে শুয়ে পড়া যায়। এ ছাড়া বর্তমানে গামছা দিয়ে বানানো হচ্ছে জুতা, ঝুড়ি সেট, ঝোলা ব্যাগ, ল্যাপটপ ব্যাগ, পানির বোতল রাখার ব্যাগ, মোবাইল ব্যাগ, হাতের বালা, কানের দুল ইত্যাদি। কয়েকটা বড় বড় গামছা দিয়ে তৈরি করা হয় জানালার পর্দা। ভিন্ন ধাঁচে তৈরি হয় বেডশিট, বালিশের কভার। ঘর সাজাতেও ব্যবহার হচ্ছে গামছা। বিছানার চাদর, বালিশ, সোফার কুশন কভার, ম্যাট এমনকি খাবার টেবিলের রানার হিসেবেও ব্যবহার হচ্ছে গামছা। ঘরের কোণে রাখা টেবিল ল্যাম্পটির ঢাকনাও গামছার তৈরি। গামছার রং অনেক উজ্জ্বল হওয়ায় এর ব্যবহারে অন্দরের শোভা অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়। গ্রাম বাংলায় গামছার ব্যবহার হয় শপিং ব্যাগ হিসেবেও।

এছাড়া রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্যও গ্রামের মানুষ গামছায় মাথা ঢাকে। মশা-মাছি তাড়ায় তাও গামছা দিয়েই। গামছা একেবারে পুরানো হয়ে গেলে লেপা-মোছার ন্যাকড়া বানানো কিংবা ঘরের ঝুল ঝাড়ার কাজে লাগে গামছা। এক কথায় বাঙালি জীবন আর গামছা যেন একসূত্রে গাঁথা। বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো ও উৎপাদন প্রনালীর সাথে মিশে আছে গামছা।

বেশি ব্যবহারের কারণে গামছার ওপর চাপ বেশি পড়ে। শুধু গামছাই নয়, যে সমস্ত সুতো দিয়ে গেঞ্জির কাপড় তৈরি হয় তা সেলাই করলে টেকসই হয় না। ফলে এই জিনিসগুলো সেলাই করলে লাভজনক হয় না।

এছাড়া সবাই সেলাই করে ব্যবহার করলে চাহিদা কমে যাবে, ফলে তাঁত শিল্পের ক্ষতি হবে। তাঁতির ঘরে দারিদ্রতা নেমে আসবে। কাজেই সংস্কার মোটেই অযৌক্তিক কিছু না। তবে অনেকে বলেন, ছেঁড়া গামছা সেলাই করে ব্যবহার করলে নাকি বাড়িতে দারিদ্রতা নেমে আসে।

শুধু তাই নয়, ছেঁড়া গামছার ব্যবহার নিয়ে গ্রামেগঞ্জে একাধিক সংস্কার-কুসংস্কার রয়েছে। আর তা মেনেও চলেন অনেকে। যদিও যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব, সেভাবেই ক্রমশ এই সমস্ত সংস্কারগুলিও মুছে যাচ্ছে। তবে গামছার ব্যবহার যেভাবে কমছে তাতে আগামী দিনে এই শিল্প কিংবা এই গামছা থাকবে কিনা তা নিয়ে নানারকম সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

Post a Comment

0 Comments