শরতের বৃষ্টি
- পারভেজ
আপনার কি কখনও এই অনুভূতি হয়েছে? যেমন আপনি একটা হারিয়ে যাওয়া নীল বেলুন, বিশাল সাগরে ভেসে আসা কাঠের পচনশীল টুকরা। এটা শুনে আমাকে কি দাম্ভিক মনে হচ্ছে? ভাবছেন আমি একজন সাহিত্যিক। অবশ্যই না; আমি শুধু দুঃখি। দুঃখি ব্যক্তি কেমন যেন এক অজানা শক্তি দ্বারা আবিষ্ট হয়ে থাকে এবং হঠাৎ করে কবিতার কয়েক লাইনের মাঝে মহাবিশ্বের ভয়ঙ্কর রহস্যগুলি জানতে পেরে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষ; আমার জীবন বেশ ভালোই। অতীতের সমস্ত দুঃখজনক সবকিছু হৃদয়ের অজানা গভীরে ফেলে দেওয়া যেতে পারে বলেই আমার জীবন দুঃখের নয়। আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইব্রেরিতে বসে আছি কারণ বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে এবং লাইব্রেরিয়ান আমার প্রস্থানের অপেক্ষায় আছেন।
তাসফিয়া তাসনিম জোরা। আমার নাম। জোরা মানে হলো বৃষ্টি। আমার বাবা-মা ইচ্ছাকৃতভাবে এটি করেছেন কিনা জানি না। আমার ভাইয়ের নাম আবিনুস হাজান আদি, হাজান মানে হলো শরৎ। আমাদের নামগুলো একসাথে রাখা হলো শরতের বৃষ্টি। বেশ কাব্যিক, তাই না? আমি তাকে আবিনুস থেকে আবি বলে ডাকি; তুর্কিশ ভাষায় আবি মানে বড় ভাই। কিন্তু এটা এখনও আমাকে ভাবায় যে কেবল শরত হলে কিংবা শুধু বৃষ্টি হলে কি হতো? একজন আরেকজনকে ছেড়ে চলে গেলে কী হয়?
লোকজনের রঙিন ছাতা মাথায় হেঁটে চলা আর তার সাথে গাছের লাল, কমলা, হলুদ পাতাগুলোর যে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য - তার এক চিত্র এঁকে দিয়ে যায় শরতের বৃষ্টি। বৃষ্টি নিজে নিজেই কেবলমাত্র ধূসর।
লাইব্রেরি ছিল আমার ভাইয়ের প্রিয় জায়গা। গ্রন্থাগারিকাও তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকতে দিতেন। কারণ তিনি তাকে তার প্রিয় সন্তানের মতো করে পছন্দ করতেন। করুণা করেছিলেন এমন নয়; মনে হয়, হয়তো তিনি করেছিলেন যখন জানতে পেরেছিলেন যে আমাদের মায়ের যত্ন নেওয়ার জন্য তাকে তার স্বপ্ন ছেড়ে দিতে হবে।
স্টেজ থ্রি ক্যান্সার। কেন আমাদের বাবা তার যত্ন নিলেন না? কেন আমি করিনি? কেন তাকে? বাবা মনে করেন নি যে কাজ মায়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ - তিনি সে ধরণের ব্যক্তি ছিলেন না। বিষয়টা এমন ছিল যে কাউকে টাকার জন্য কাজ করা আবশ্যক হয়ে পড়েছিল। আমি মনে করি না যে ব্যালে মায়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ - আমি এমন না। শুধু এটাই যে কাউকে স্বপ্ন দেখার জন্য যোগ্য ও উপযুক্ত হতে হয়।
আমার ভাইয়া- আবিকে আমি ডাকলাম; হসপিটাল থেকে বের হওয়ার পথে আমাকে বলেছিল," Listen my little Jora, things aren’t always easy, but you just have to keep going and don’t let the small stuff bog you down. There’s nothing I can really do but keep going out there. You never give up, even when you should. আনাতা নারা ইয়ারেরু! (তুমি পারবে)।"
ভাইয়াকে বিভিন্ন ভাষায় কথা বলতে শুনে বুঝতে পেরেছিলাম ভাইয়া গম্ভীর মেজাজে ছিল। ভাইয়া সাতটা ভাষা রপ্ত করেছিল, তাই গম্ভীর হয়ে কিছু বলতে গেলে একেক সময় একেক ভাষায় কথা বলে।ভাইয়ার কথা শুনে আমার ভালো লেগেছিল। আমি ভাইয়াকে বলেছিলাম," মা ভালো হয়ে গেলে তুমি আবার তোমার স্বপ্ন পূরণ করবে, করবে তো?"
তার মুখ যেন আঁধার ছায়ায় ঢেকে গেল, তারপর সে আমার হাত ধরল। "চলো, বাড়ি যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।" আমি এখন বুঝতে পারি যে সে মনে করেনি মা ভালো হয়ে যাবে। যে সে আবার তার স্বপ্ন শুরু করতে পারতো।
জানালার গ্লাসে বৃষ্টি ঝরে পড়ার শব্দ হচ্ছে জোরে জোরে। আমি বুক শেলফের সবচেয়ে উপরের তাকে দেখলাম। ব্যালে অনুশীলন করার ফলস্বরূপ আমি সেখানে আমার পা রাখতে সক্ষম হতাম। আমার বান্ধবীদের ধারণা আমার হাত-পা রাবারের তৈরি, তারা মনে করতো আমার শরীরে হাড় নাই। যদি আমি এখন সেটা করি তবে আমার পেশীতে টান ধরতে পারে এবং এক সপ্তাহ ধরে হাঁটতে পারব না।
আমার ব্যালে শিক্ষক বলতেন: তুমি একদিনের জন্য অনুশীলন করবে না তো তোমার শরীর এটি অনুভব করতে পারে। তুমি দুই দিন অনুশীলন করবে না এবং তুমি এটি অনুভব করতে পারো। তুমি তিন দিন অনুশীলন করবে না এবং অন্য সবাই এটি অনুভব করতে পারে। আমার তিন দিন এখন মাস হয়ে গেছে।
আমার ভাইয়া সবসময় আমার খেয়াল রাখতো। আর আমি সবসময় আঘাত পেতাম। একদিনের ঘটনা- "সব ঠিক হয়ে যাবে, শুধু আমার হাত চেপে ধর। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হয়ে যাবে।” আমার চোখ ইতিমধ্যেই অশ্রুতে ঝাপসা হয়ে গেছে এবং আমার গলায় চিৎকার আটকে গেছে। ডাক্তার আমার হাঁটু আবার আগের জায়গায় সেট করে দিলেন আর আমি আমার ভাইয়ের বুকে পনের মিনিট ধরে কেঁদেছিলাম।
আমি আঘাত সহ্য করতে পারি। কিন্তু ভাইয়ার সামনে আমার দুই গালে বারিধারা বয়ে গেছিলো। এরপর সহ্য করতে না পেরে গলা ছেড়ে চিৎকার করেছিলাম। " ঠিক হয়ে যাবে, মন খুলে কান্না করা ভালো, আমরা যখন বাড়ি যাব, আদি তোমাকে গরুর মাংসের কালাভুনা করে খাওয়াবে।" - বাবা বলেছিলেন। আমার ভাইয়া খুব ভালো রান্না করতে পারতো। তাকে রান্না করা শিখতে হয়েছিল। আমি ভাইয়ার হাতের গরুর মাংসের কালাভুনা খুব মিস করি।
আমি একটি বই নিয়েছি এবং পড়ার চেষ্টা করছি, কিন্তু আলো খুব ম্লান, এবং শব্দগুলো কেবল কালো ঝাপসা। "জোরা!" গ্রন্থাগারিকা বললেন। "বৃষ্টি থেমে গেছে।" "ধন্যবাদ," আমার ব্যাগ তুলে নিয়ে বলি। হয়তো তিনি আমার চোখে কিছু অশ্রুবিন্দু দেখেছেন অথবা হয়তো আমায় শুধু দুঃখী দেখাচ্ছিল। "তুমি ঠিক আছো, জোরা?" তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
আমি মুচকি হাসি দিয়ে বললাম, "আমি ভালো আছি" ; " বলার জন্য ধন্যবাদ।"
ফুটপাথ ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে গেছে। তুমি ঠিক আছো? - এই প্রশ্ন কি সত্যিই কিছু পরিবর্তন করতে পারে? - সব ঠিক আছে? - একটি প্রশ্ন করে সত্যিই কি একটা জীবন বাঁচানো যায়?
যদি তাই হয়, আমার জিজ্ঞাসা করা উচিত ছিল। মা ক্যান্সার-মুক্ত হওয়ার পর আমার ভাই ভালো হয়ে যাবে এমনটা ভাবা উচিত হয়নি। গ্রীষ্মে তার লম্বা হাতার নীচে মসৃণ ত্বক ছিল। তার অন্তরে অদৃশ্য এক অন্ধকার ছিল না।
যখন দুশ্চিন্তা বাড়ে, তখন ওজন কমে যায়। এমনকি সেই চিন্তার আর প্রয়োজন পড়ে না। আবি যা করেছে সব চিন্তা ছিল। মা এবং তার সম্ভাব্য সুস্থতা নিয়ে উদ্বিগ্ন, বাবা এবং তার কাজের চাপ নিয়ে উদ্বিগ্ন, আমার জন্য চিন্তা। আবি-ই ছিল যে আমার সবচেয়ে বেশি যত্ন করতো।
যখন কেউ যন্ত্রণায় থাকে, অন্তর ব্যাথায় কন্কন করার অনুভূতি ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় ও তা ছড়িয়ে যায় এবং বৃদ্ধি পেতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না সেই যন্ত্রণা বাইরের প্রকৃতিতে মিশে যায়।
আমি এত যত্ন করি যে আমার হৃদয় তোমার জন্য ব্যাথা করে। আমার হৃদয় এখন তার জন্য ব্যাথা করছে, কিন্তু সে চলে গেছে। সে বলেছিল," You never give up, even when you should." কিন্তু সে তো চলে গেছে।
আমি ব্যালে বন্ধ করে দিয়েছিলাম কারণ আমার স্বপ্ন ভেঙ্গে গিয়েছিল। এটা আর স্বপ্ন হতে পারে না। কারণ সে চলে গেছে। নীরস, অসাড়, নিষ্প্রাণ, জড়, জীবনশূণ্য, মৃত। পৃথিবী থেকে চলে গেছে। একটি কাটা নিরাময় হতে পারে। একটি গভীর কাটা দাগ আরোগ্য হতে পারে। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে যার পর সে গভীর হয়ে যায় অনেক গভীর।
যতগুলা হোক না কেন, সেলাই এবং ব্যান্ডেজ আগের মতো একত্রিত করতে পারে না। 'তুমি ঠিক আছো?' , 'আমি তোমাকে স্নেহ করি অনেক' - অসংখ্য বার বললেও কিছুই ঠিক হবে না আর। তুমি একা নও, আমি তোমার পাশেই আছি, তোমাকে সবাই ভালোবাসে, তুমি যেটুকু মনে কর তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি।
আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে, আর আমি দাঁড়িয়ে থাকি। বৃষ্টি পড়ছে। আমি চোখ বন্ধ করে শুনি। আমি লাল, কমলা এবং হলুদ এর সাথে মনে করি শরতকে। আমার শরীর বৃষ্টির সাথে আমার সঙ্গীত হিসাবে চলে। আমার পেশী শক্ত, কিন্তু আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এগারো বছরের যন্ত্রণা এবং ঘামের মুখোশকে এমনভাবে সরানোর কথা মনে করে যা আমার নড়াচড়াকে শিল্পে পরিণত করেছে।
আমার হৃদয় যন্ত্রণা করে কারণ আমি যন্ত্রণায়। আর আমি নৃত্য করি কারণ আমি ভালোবাসি। আমার দুই বাহু চারিদিকে বৃষ্টি-জল ছড়িয়ে দেয়। হাত বাড়িয়ে দিই একটা ছাতার জন্য, একজনের জন্য, কেউ একজন যে বৃষ্টিতে আমাকে টেনে উপরে তুলবে। বৃষ্টিতে ভেজা মাটি যেন বেশি উষ্ণ!
তুমি বলো তুমি বড় ভাই আর আমি ছোট ভাই, তাই তুমি আমাকে বাতাস থেকে আটকাবে, বৃষ্টি থেকে রক্ষা করবে। তাই আমিও তোমাকে বাতাস থেকে আটকাবো, বৃষ্টি থেকে রক্ষা করবো।
" Words can't express my thoughts
Letters can't connect the dots
To express how special you are
You, my brother, are a star."
.jpg)
0 Comments
Thank you for commenting! Your feedback means a lot. 😊