যদু ভাই বেশ ভালোই আছেন -০২

 



যদু ভাই বেশ ভালোই আছেন -০২


রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছি। ল্যাম্পপোস্ট আশেপাশে নাই। মানুষজন খুব কম। শীতের রাতে কোনোরকম আওয়াজ নাই চারিদিকে, কেবল কুকুরের আর্তনাদ থেকে থেকে শোনা যাচ্ছে। আমি তাকিয়ে আছি শূণ্যে... এমন সময় আমার ঘাড়ে হাত! পিছনে ঘুরতেই ভয়ংকর এক ছায়া! আর সে ছায়ার চোখ জ্বলজ্বল করছে! আমার চোখ বড় হয়ে গেল। বুকটা কেমন ছটফট করতে লাগলো। আমি দৌড় দিতে চাইলাম, কিন্তু পা তুলতে পারলাম না, রাস্তায় জমে গেছে। আমি দুয়া পড়তে পড়তে রাস্তায় কখন পড়ে গেছি, আমি নিজেও বুঝতে পারিনি। ছায়াটা আমার দিকে ঝুঁকে -

- কি রে! ভয় পেলি নাকি?

- ( আমি সভয়ে হাবলার মতো তাকিয়ে আছি )

- আরে, গাধা! আমাকে চিনতে পারিস নি! আমি তোর যদু ভাই‌ রে!

- অ্যা ! (জোরে চিতকার করে ) যদু ভাই তুমি?!

- হ্যা, তবে চিতকার করে বলছিস কেন!

- ( ভালো করে দেখে ) যদু ভাই সত্যিই তুমি!

- না, আমি না। আমার ভূত এসে কথা বলছে!


যদু ভাইকে ভূত বললে ভুল হবে না, মনে হয়। যদু ভাইয়ের গায়ে কালো পোশাক, অন্ধকারে মিশে গেছে, আলো না পড়লে বোঝা মুশকিল যে মানুষ না ভূত। যদু ভাইয়ের জুতা কালো। গায়ে দিয়েছে লম্বা কালো জ্যাকেট, তার মধ্যে যদু ভাই আরামেই মিশে গেছে। হাতে আছে কালো হাত মোজা, গলায় কালো মাফলার, মুখে কালো মাস্ক, মাথায় কালো টুপি। কেবল চোখে আছে সাদা চশমা যেটা একটু আগে জ্বলজ্বল করছিল বলে আমার ভ্রম হয়েছিল। কিছুই হয়নি- এমন ভান করে, আমি জুতার ফিতা শক্ত করে বেঁধে উঠলাম।

- হ্যা, বলেন; কি জন্য ডাকছিলেন! আমার ১ তারিখে পরীক্ষা, কিছু পড়া হয়নি, বাসায় গিয়ে পড়তে হবে।

- রাখ তোর পড়া। সারাজীবন তো পড়েই আসলি। কিছু করতে পারছিস! ঐ চায়ের দোকানে চল। অনেক গল্প আছে।


অগত্যা যদু ভাই আমাকে চায়ের দোকানে টেনে নিয়ে গেল। যদু ভাইকে কিছু বলাও যায় না। আমিও নিরুপায়, গেলাম। যদু ভাই দুইটা দুধ চায়ের অর্ডার দিলো। টুলের উপর দুজনে বসলাম। যদু ভাই কিছু বলার আগে একদম নিশ্চুপ হয়ে যায়, যেন যদু ভাই এখন আমাকে বোঝাবে কি করে টাইম ট্রাভেল কাজ করে কিন্তু শুরুটা খুঁজে পাচ্ছে না! হঠাৎ -

- এত পড়া পড়া যে করিস, কি পড়বি সেটাই তো জানিস না। তাহলে তুই পড়বি টা কি! আর ধর, তুই ভালো করে পড়লি, একটা ভালো চাকরিও দিলাম তোকে, এরপর? একটা প্যাশন থাকতে হবে।

আমার বড় ভাই মদু - কেই দেখ! মদু ভাই ক্রিকেট বেশ খেলতে পারতো, একাই দাঁড়িয়ে থেকে ম্যাচ জিতিয়ে দিতো। তাই বলে মদু ভাই পড়েনি এমন না, পড়েছে, যেটুকু প্রয়োজন। আমরা সবাই মনে করতাম মদু ভাইয়ের প্যাশন হচ্ছে খেলার দিকে - কিন্তু না! মদু ভাইয়ের প্যাশন হচ্ছে মানুষের মুখে হাসি ফোটানো; তাই তো মদু ভাই ডাক্তারি পড়লেন। এখন অবশ্য মদু ভাই খুব ব্যস্ত, রোগী দেখতে হয় সারাক্ষণ। তারপরও কিছুদিন আগে সময় করে আমাদের ডিনারে ডাকলেন, বেশ খাওয়া-দাওয়া হলো, গল্পসল্প হলো।...

- তা..তাইলে বলছো যে, প্যাশন থাকতে হবে! আমার তো সেরকম কিছু নাই!

- সেটাই তো, কেন নাই? খুঁজে বের কর একটা! 

- ( আমি খোঁজার চেষ্টা করছি... )

- মাথায় অত চাপ দিস না। বাসায় যা, কয়েকদিন ভালো মতো চিন্তা করে দেখ... 


এরমধ্যে যদু ভাই চায়ের টাকা দিলেন। "চল হাঁটতে থাকি...", বলে যদু ভাই হাঁটা শুরু করলো। আমিও সাথে সাথে হাঁটছি।

- আসল ব্যাপারটা হলো তোদের এই জেনারেশনের ছেলেমেয়েরা ভবিষ্যত নিয়ে ভাবেই না। আমাদের বাড়িওয়ালীকেই দেখ না। অলরেডি ৩য় তলার কাজ শুরু করে দিছে। একদিন বলছে-

- (ভাড়াটিয়াদের) আপনারা হলেন আমার লেফ্টি আর রাইটি।

- (লেফ্টি ভাড়াটিয়া) কেমন করে!?

- দুই হাত দিয়ে কাজ করে যেমন ইনকাম হয়, আপনাদের কাছ থেকে সেরকম ভাড়া পাই! আপনাদের কাছ থেকে টাকা নিব আর ৩য় তলার পুরা কাজ করে ২য় তলা ভাড়া দিব।


- তাইলে ৩য় তলা ফাঁকা থাকবে?!

- ফাঁকা কেন থাকবে রে গাধা! ৩য় তলায় বাড়িওয়ালী উঠবে। আহ! আমি যেটা বলছি সেটা শোন না! তাহলে দেখ, একজন বাড়িওয়ালীর চিন্তা ভাবনা যদি এরকম হয়, তাহলে তোর কেমন হওয়া উচিত!

- হুম (দীর্ঘশ্বাস ~)

- মন খারাপ করিস না। জানুয়ারি মাস অনেক লাকি, এ বছর। তোর-ও কিছু একটা হয়ে যাবে।

- (আমি ভাবছি আমার কি- কিছু একটা হবে!!)

এমন সময়ে ফোনে রিং বেজে উঠল।যদু ভাই ফোন দেখতেই তড়িঘড়ি করে কল রিসিভ করলো-

- হ্যালো

- ..........

- না, কিনিনি; বাসায় যাওয়ার আগে কিনে নিয়ে যাব।


চিন্তার ছাপ নিয়ে যদু ভাই পকেটে ফোন রাখলো। আমাকে বলছে-

- দেখতো আশেপাশে কোথাও ভিমবার পাওয়া যায় কিনা!

- (আশেপাশে তাকিয়ে) যদু ভাই, ঐ যে একটা দোকান খোলা আছে। পাওয়া যেতে পারে।

দুজনে গেলাম। যদু ভাই বড় সাইজের একটা ভিমবার কিনলো। দোকানিকে টাকা দিলো। এরপর টেনশন ফ্রী হয়ে যদু ভাই বলছে-

- বুঝলি! জীবনটা কত সুন্দর! সব জিনিসের দাম বেশি, তাই বলে সব জিনিসের দরকার আছে নাকি।

- ঠিক বলছেন, যদু ভাই।

- চল, আজকে তোর ভাবী গরুর মাংস রান্না করছে, খেয়ে তারপর বাড়ী যাস। 

- না, যদু ভাই, আজকে না, অন্য আরেকদিন যাবোনি।

- (যদু ভাই রিক্সায় উঠে) আয়, আয়। উঠে পড়। তোর কোনো কথা শুনবো না। তোর নাম করে আমিও দুই পিস বেশি খেতে পারবো। রিক্সায় উঠে পড়।

যদু ভাইকে কিছু বলা যায় না। অগত্যা উঠলাম রিক্সায়। যদু ভাইয়ের বাসায় গেলাম। সবাই খুশি, যদু ভাইও খুশি আর আমি তো এমনেও খুশি।

Post a Comment

0 Comments