হঠাৎ শীতের এক রাতে!
"আজই শেষ দিন! বোনাস সহ ৩জিবি- ৫৫টাকা-৩০দিন (১ বার)... ।"
(টুং করে আওয়াজ হলো) দেখলাম জিপি থেকে ফোনে মেসেজ আসছে। এরকম অফার পাওয়া দুষ্কর (যদিও জিপি বরাবরই আমাকে ভালো ভালো অফার দিয়ে আসছে)। অফারটা নেওয়ার জন্য লোভ হলো। তবে একটা সমস্যা আছে, সেটা হলো আমার বাসায় জিপির ফোরজি নেটওয়ার্ক থাকলেও খুব দুর্বল, তাই জিপিতে সাধারণত টুজি নেটওয়ার্ক-ই থাকে।
একবার ভাবলাম - নাহ, প্রয়োজন নাই, ইন্টারনেট প্যাকেজ কিনে তো ইউজ করাই মুশকিল হয়ে যাবে। শেষে, না ব্যবহার করে মেয়াদ ফুরায় যাবে, টাকাই নষ্ট! তাইলে, আজকে আর বাইরে বের হব না। রাত সাতটা বাজতে চললো। ঘরের মধ্যেই শীত শীত লাগছে।
কিছুক্ষণ পর কি মনে করে~ শীতের কাপড় পরে, টাকা নিয়ে বের হলাম। কিছুদূরেই ফ্লেক্সিলোডের দোকানে-
- জিপি রিচার্জ হবে?
- হ্যা, হবে... নাম্বার বলেন...
- 01*********
- দেখেন, ঠিক আছে?
- (এত এত, এত এত) হ্যা, ঠিক আছে।
- কত টাকা?
- *** টাকা।
(টুং টুং করে কয়েকবার শব্দ হলো) চেক করলাম, রিচার্জে টাকা আসছে, দোকান থেকে বের হয়ে গেলাম। রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। আজকে শুক্রবার, গাড়িঘোড়া কম, মানুষজনও নাই তেমন। শীতের এ রাতে দৌড়ে বেড়াচ্ছে পবণ, আর মাথার উপরে পড়ছে কুয়াশা, ধোঁয়ার মতো করে। ফোনে দেখলাম সময়- সাতটা বেজে চৌদ্দ মিনিট। এখন কি করা যায়? বাইরে যখন বের হইছি, বর্ণালীর মোড় থেকে ঘুরে আসা যাক। দুই হাত দুই পকেটে। দুই পা চলছে সামনে, এক ধাপ, দুই ধাপ...
দিনের তুলনায় মানুষ কম ঠিকই কিন্তু কম বলা চলে না। হয়তো কেউ বাসায় ফিরছে, কিংবা কেউ বন্ধুদের সাথে দেখা করতে বের হয়েছে- দেখা করবে, চা খাবে, আজগুবি গল্প করবে!, কিংবা কেউ কেউ পেটের দায়ে এখনো ঘরের বাইরে ঘুরছে! এই শীতের রাতে কেউ তাকিয়ে আছে সামনের গাড়ির দিকে, কেউ তাকিয়ে দেখছে সামনে আর হাঁটছে, কেউ বা আবার একে অপরের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে আর হাঁটছে। হোঁচট খেয়ে না পড়লেই হলো!
বর্ণালী মোড়ের কাছে চলে এসেছি। আমি হেঁটে চলেছি। রেল লাইন পার হয়ে, ঘুরে, বাড়ির পথ ধরবো। এমন সময়-
- মামা!...মামা!
(আমি দুই ধাপ দিলাম) আমাকে ডাকছে! আমার কি টাকা পকেট থেকে পড়ে গেছে! পকেট তো ছেঁড়া নাই। তাইলে কি আমাকে ডাকছে নাকি অন্য কাউকে! (এক ধাপ দিলাম...)
- মামা!...মামা...(মনে হলো যেন এ ডাক আমার জন্য) মামা!
আচ্ছা একবার ফিরে দেখি। রিক্সায় বসে আছেন একজন আর আমাকে ডাকছেন। কনফিউজড চেহারা নিয়ে গেলাম মামার কাছে। (এর মধ্যে আমার মাথা- এমন কোনো রিক্সাওয়ালা মামা যাকে আমি চিনি, সার্চিং...) হ্যা, মনে পড়েছে, একজনকে চিনি, নাম...
- মামা, ভালো আছেন? আমার নাম্বার নিছিলেন। (খুশিতে)
নাম হলো- খাইরুল মামা। (মনে পড়েছে) আমি প্রায় অবাক! আমার তাকে চিনতে কষ্ট হলো, কারণ তার চেহারা আমার মনে নাই। অথচ মামা আমাকে চিনতে পারছে, তাও আবার রাতে! (মামাকে দেখার পর ধীরে ধীরে চেহারা মনে পড়লো, নামের সাথে চেহারা মিলে গেলো)
- হ্যা। আপনার নাম খায়রুল না, মামা?
- হ্যা, মামা (মুখে হাসি)
- ভালো আছেন? (মুখে বিষ্ময় ও হাসি)
- আছি, মামা (ম্লান হাসি)। অনেকদিন পর দেখা... (আনন্দে)
খায়রুল মামা ডান হাতের দুই আঙ্গুলে একটা সিগারেট নিয়ে রিক্সার চালকের সিটে বসে আছে।
- হুম, অনেকদিন হয়ে গেল। আপনি এখনো বাইরে আছেন! সেদিন তো আগেই বাড়ি গেছিলেন।
- একেক দিন একেক সময়ে যাই। ঠিক নাই মামা।
- কয়টা পর্যন্ত আছেন বাইরে?
- দশটা পর্যন্ত থাকি...
- লোক পাওয়া যায়!
- লোক...থাকে। দশটা পর্যন্ত লোক পাওয়া যায়, তারপর কমে যায়।
- শীতের সময়, লোক না থাকলে বাড়ি চলে যাবেন!
- না, শীত হলেও লোক থাকে... আচ্ছা মামা...
- চা খাবেন? চলেন...
- (সঙ্কোচ) চা খাওয়া যায়...
- চলেন, সামনেই দোকান...
রিক্সায় উঠলাম, মামা নিয়ে গেলেন চায়ের দোকানের সামনে...
- কোনটাতে খাবেন? বামের টাতে নাকি ডানের টাতে?
- চলেন, একটাতে...
- বামের টাতে ভীড় বেশি, সময় লাগবে অনেক...
- মামা, আমি বেশি দেরী করবো না।
- চলেন, ডানের টাতে চলেন...
এখানেও ভীড় কম না। চাওয়ালা মামাকে বললাম, মামা দুইটা লাল চা দিয়েন, একটাতে লিকার বেশি, চিনি কম। চাওয়ালা মামা, মামা তাইলে একটু দেরী হবে। আমি, আচ্ছা দেন। দুইটা লাল চা হলো- নিয়ে গেলো, তিনটা দুধ চা হলো- দেয়া হলো, আবার দুইটা লাল চা হলো- চা পানকারীর হাতে দেয়া হলো। বুঝলাম আসলেই দেরী হবে।
মামাকে যেখানে দেখেছিলাম সেখানে নাই। এদিকে ওদিকে তাকিয়ে খুঁজে পেলাম না। রিক্সার দিকে তাকালাম, রিক্সা দাঁড় করানো আছে। (তাইলে মামা হয়তো কোথাও বসেছে, কিন্তু কোথায়!) চাওয়ালা মামা, আপনার কি চা? আমি বললাম। আমার পিছনে তাকিয়ে দেখলাম মামা দাঁড়িয়ে আছে। চাওয়ালা মামাকে বললাম, মামা দুইটা টুল ফাঁকা আছে? মামা একটা টুল দিয়ে বললো, এটা লেন আরেকটা দিচ্ছি। আমি সেটা নিয়ে মামাকে বসতে বললাম। আরেকটা তার পাশে রেখে দিলাম।
এবার চা নিতে এলাম। এতগুলা কাপ একসাথে রেখে, ছাঁকনি পরিস্কার করে, চাওয়ালা মামা সবার জন্য চা বানানো শুরু করলেন। আমারটা তৈরি করে আমাকে দিলেন। আমি নিয়ে মামার কাছে গেলাম। মামাকে একটা দিলাম, লিকার বেশি চিনি কমেরটা। আমরা রাস্তার পাশে বসে এই শীতে ধোঁয়া উঠা গরম চায়ের মজা নিচ্ছিলাম। আর আমাদের পাশে রাস্তা দিয়ে বিভিন্ন গাড়ি চলে যাচ্ছে, যাচ্ছে হরেক কাপড়ের মানুষ!
- বাড়ির সবাই ভালো আছে মামা?
- হ্যা, আছে।
- যে শীত পড়ছে! ভালো থাকাই মুশকিল। তারপরও...
- ভালোই আছে...বৃদ্ধ লোকের একটু সমস্যা, তাছাড়া ভালোই...
- মামা আপনি কোনদিকে গাড়ি চালান বেশি?
- আমি সব দিকেই গাড়ি চালাই। যে যেদিকে যায় আমিও সেদিকে যাই।
- ও! হুম। ঠিকই আছে।
- দূরের কাছের, সব মিলায় হয়ে যায়
- হুম, মামা আপনার বাসায় কে কে আছে?
- সবাই আছে...
- ছেলেমেয়ে কয়টা, মামা?
- একটা ছেলে, একটা মেয়ে...
- হুম, ভালোই...
- ছেলে কোন ক্লাসে পড়ছে?
- ক্লাস এইটে...
-ওহ, বড়ই তো হয়ে গেছে তাইলে!
- না, ক্লাস ফাইভ... সিক্সে পড়ে।
- ওহ, আচ্ছা। সিলেবাস চেঞ্জ হলো, নতুন সিলেবাসে...
- নতুন সিলেবাস
- নতুন সিলেবাস তো! প্রথমে একটু অসুবিধা হবে, তারপর ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে...
- মামা, আমি যায়...
- চলে যাবেন!... ( মামা তাকিয়ে আছে রিক্সার দিকে, আমিও তাকালাম, দেখলাম একটা রিক্সা পিছনে আটকে আছে...) আচ্ছা, ঠিক আছে মামা। (সালাম দিলাম)
- (চায়ের কাপ রেখে, সালামের উত্তর দিলেন, আবার পরে কথা হবে- এরকম কিছু বলে চলে গেলো...)
মামা রিক্সায় যায়ে বসলো, একটু পরে চলে গেছে যখন আমি চায়ের কাপ দুটো হাতে নিচ্ছিলাম। আমি চেয়ে থাকলাম ঐ দিকে~ তারপর চায়ের কাপ জমা দিয়ে দোকান থেকে বের হলাম। এসময় ভালোও লাগছিল, খারাপও লাগছিল। ভালো লাগছে এজন্য যে, অনেকদিন পর দেখা হওয়ার পরেও আমাকে চিনতে পারছে আর হঠাৎ করে আমাদের এ মামার সম্পর্কের বন্ধন আরেকটু শক্ত হলো; খারাপ লাগছে কারণ বিস্কুট নিত কিনা জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি আর হঠাৎ করে চলে গেল!
খুশি খুশি লাগছে। গুনগুনিয়ে চলেছি আর হাঁটছি। বাসার দিকে যাচ্ছি। হঠাৎ করে -
- এই!
- (দেখলাম... সালাম দিলাম)
- (সালামের উত্তর) কি খবর?
- (আমরা একসাথে গণিত প্রাইভেট পড়েছি, ভালো বন্ধু) এইতো, বর্ণালী গেছিলাম চা খেতে।
খোঁজখবর নিলাম। সে তার বাড়ির দিকে যাবে, অটোর জন্য অপেক্ষা করছিল। অটো আসতে দেখে-
- আচ্ছা, থাকো। যাই তাইলে।
- আচ্ছা, আল্লাহ হাফেজ।
সে অটোতে বসে গেল। আমি, এইদিকে আসলে জানায়ো আমাকে, দেখা সাক্ষাৎ হবে।
- আচ্ছা, ঠিক আছে।
অটো চলে গেলো, আমি দেখলাম। পকেটে হাত রেখে, হাঁটছি। তারপরও হাতে ঠাণ্ডা লাগছে। আমি হাঁটছি। মনে কেমন যেন খুশি খুশি লাগছে তবে তার মধ্যে কোথাও একটু বোধ হয় বিষন্নতা ছিল! কিন্তু কেন!? আমি জানি না। আমি বাড়ি চলে আসলাম। ফোনে দেখলাম, সময় সাতটা বেজে চুয়াল্লিশ মিনিট। দেখি! ভাবছি, জিপিকে জানাব আমার বাসার নেটওয়ার্কের কথা। যদি নেটওয়ার্ক ঠিক হয়ে যায়! গোল পৃথিবীতে নিয়তির খেলায় কখন কি হয়, কে জানে!

0 Comments
Thank you for commenting! Your feedback means a lot. 😊